চেতনার ম্যালেরিয়া: উইলহেল্ম রাইখ ও মতাদর্শের রোগতত্ত্ব
in
“চেতনার ম্যালেরিয়া: উইলহেল্ম রাইখ ও মতাদর্শের রোগতত্ত্ব”
— মতাদর্শ, যৌন দমন ও মানব মুক্তির মনোবিশ্লেষণমূলক পাঠ
ভূমিকা: মতাদর্শ—চেতনার জ্বর
মানব সমাজে মতাদর্শ বা Ideology সাধারণত এক ধরনের ধারণা, দর্শন বা রাজনৈতিক বিশ্বাস হিসেবে বিবেচিত হয়। কিন্তু উইলহেল্ম রাইখ (Wilhelm Reich), যিনি মনোবিশ্লেষণ ও সমাজমনস্তত্ত্ব উভয় ক্ষেত্রেই বিপ্লব ঘটিয়েছিলেন, তিনি একে শুধুই চিন্তার বিষয় হিসেবে দেখেননি। তার মতে, মতাদর্শ হলো একটি মানসিক ও সামাজিক রোগ, যা মানুষের চেতনায় “ম্যালেরিয়ার জ্বরের মতো” সংক্রামিত হয়— ধীরে ধীরে তাকে চিন্তাশক্তিহীন, অনুভূতিহীন ও আনুগত্যপ্রবণ করে তোলে।
রাইখ লিখেছিলেন —
“If an ideology has a ‘retroactive effect on the economic process,’ it must have become a material force.”
অর্থাৎ, কোনো মতাদর্শ যদি অর্থনৈতিক ও সামাজিক জীবনে প্রভাব ফেলতে শুরু করে, তবে তা আর কেবল ধারণা থাকে না—এটি পরিণত হয় এক বস্তুগত শক্তিতে, এক সংক্রামক রোগে।
১. মতাদর্শ ও ‘মানসিক সংক্রমণ’
রাইখ তাঁর বিশ্লেষণে মতাদর্শকে তুলনা করেন “emotional plague” বা অনুভূতির মহামারীর সঙ্গে। তিনি বলেন, মতাদর্শ মানুষকে প্রভাবিত করে যুক্তির মাধ্যমে নয়, বরং অনুভূতির মাধ্যমে। যখন কোনো সমাজে ভয়, অনিশ্চয়তা, ধর্মীয় বিভ্রম বা যৌন দমন প্রচলিত হয়, তখন মানুষের অবচেতন মন সহজেই মতাদর্শের প্রভাবে “সংক্রমিত” হয়ে পড়ে।
তিনি বলেন —
“Civilization operates as a self-imposed confinement of the powers of bodies and pleasures.”
অর্থাৎ, সভ্যতা নিজেই তার শরীর ও আনন্দের শক্তিকে বন্দি করে রাখে— এবং এই বন্দিত্বই জন্ম দেয় মতাদর্শের উপযুক্ত আবহ।
এই আবদ্ধতা মানুষের ভেতর অপরাধবোধ, লজ্জা, ভয় এবং আত্মনিন্দার জন্ম দেয়। এরপর সেই মানসিক দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে মতাদর্শ তাকে “রোগগ্রস্ত আনুগত্যে” পরিণত করে।
২. যৌন দমন: মতাদর্শের জন্মভূমি
রাইখের সবচেয়ে মৌলিক ধারণা হলো—যৌন দমনই মতাদর্শের মূল শিকড়। সমাজ, ধর্ম ও রাষ্ট্র একত্রে মানুষের স্বাভাবিক যৌন প্রবৃত্তিকে নিয়ন্ত্রণ করে তাকে “শৃঙ্খলাবদ্ধ চরিত্রে” রূপ দেয়। এই চরিত্রই পরে হয়ে ওঠে ফ্যাসিবাদ, ধর্মান্ধতা ও কর্তৃত্ববাদের ভিত্তি।
রাইখ বলেন —
“The wife must not figure as a sexual being, but solely as a child-bearer. Sexually awakened women would mean a complete collapse of the authoritarian ideology.”
অর্থাৎ, যদি নারী নিজের যৌন চেতনায় স্বাধীন হয়, তাহলে কর্তৃত্ববাদী মতাদর্শ ভেঙে পড়বে। পরিবার ও ধর্মীয় নৈতিকতার মাধ্যমে যৌনতা দমন করা হয় যেন সমাজে আনুগত্য টিকে থাকে, বিদ্রোহ না জাগে।
যেখানে যৌন স্বাধীনতা নেই, সেখানে স্বাধীন চিন্তাও সম্ভব নয়—এই তত্ত্ব রাইখের চিন্তার মূল ভিত্তি।
৩. জনগণের মনস্তত্ত্ব: কেন মানুষ দাসত্ব পছন্দ করে
রাইখের প্রশ্ন ছিল —
“মানুষ যখন চিন্তা করতে পারে, তখন কেন সে ফ্যাসিস্ট নেতার অনুসারী হয়?”
তার উত্তর—কারণ মতাদর্শ মানুষের চিন্তা নয়, অনুভূতি নিয়ন্ত্রণ করে। একজন মানুষ যুক্তিতে মুক্ত হতে পারে, কিন্তু যদি তার অবচেতন ভয়, অপরাধবোধ, ও দমনপ্রবণতা থেকে যায়—তাহলে সে সহজেই যে কোনো কর্তৃত্ববাদী মতাদর্শে আশ্রয় খুঁজে নেয়।
তার ভাষায়,
“Ideology does not enter the head through logic; it enters through emotion.”
এই সংবেদনশীল স্তরে যখন রাষ্ট্র, ধর্ম বা জাতীয়তাবাদ কাজ করে, তখন জনগণ নিজের দমনকেই “পবিত্র কর্তব্য” মনে করতে শেখে। ফলে, সমাজ একপ্রকার মানসিক ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হয়—যেখানে আক্রান্ত মানুষ নিজেই রোগকে পূজা করে।
৪. মুক্তির পথ: যৌন-চেতনার বিপ্লব
রাইখ বিশ্বাস করতেন, সমাজকে মুক্ত করতে হলে কেবল রাজনীতি বা অর্থনীতির পরিবর্তন যথেষ্ট নয়— দরকার মানুষের অনুভূতির বিপ্লব।
তিনি প্রস্তাব করেন একটি ধারণা — Orgastic Potency, অর্থাৎ মানুষের পূর্ণ যৌন-মুক্তির ক্ষমতা।
তিনি বলেন —
“Not a single neurotic individual possesses orgastic potency.”
অর্থাৎ, যে ব্যক্তি তার অনুভূতি, শরীর ও কামনাকে দমন করে, সে কখনও মানসিকভাবে সুস্থ হতে পারে না। তার অবচেতন সবসময় ভয় ও দমনে পরিপূর্ণ থাকে—যা পরে রাজনৈতিক আনুগত্য ও মতাদর্শিক অন্ধত্বে রূপ নেয়।
এই কারণে, রাইখের মতে সত্যিকারের বিপ্লব মানে শুধু শ্রেণি পরিবর্তন নয়, বরং মানুষের চরিত্র-বিপ্লব—মন, দেহ ও অনুভূতির স্বাধীনতা।
৫. রাইখের সমালোচনামূলক প্রভাব
রাইখের চিন্তা মূলত ফ্রয়েডের মনোবিশ্লেষণের সম্প্রসারণ, তবে তিনি মার্কসবাদী সমাজতত্ত্বের সঙ্গে তা একত্রিত করেন। ফলে তাঁর তত্ত্ব একধরনের “মনোবিশ্লেষণভিত্তিক মার্কসবাদ” তৈরি করে।
তার এই দৃষ্টিভঙ্গি পরবর্তীতে হরবার্ট মারকুজে, এরিক ফ্রম, এমা গোল্ডম্যান এবং পরবর্তী নিও-অ্যানার্কিস্ট চিন্তাবিদদের ওপর গভীর প্রভাব ফেলে।
তাঁর লেখা The Mass Psychology of Fascism (1933) আজও দেখায়—ফ্যাসিবাদ, ধর্মান্ধতা ও জাতীয়তাবাদ শুধুমাত্র রাজনৈতিক ঘটনা নয়; এগুলো সমাজের অবচেতন দমন ও অনুভূতির বিকৃত রূপ।
৬. আজকের প্রেক্ষিতে রাইখের প্রাসঙ্গিকতা
বর্তমান পৃথিবীতেও আমরা দেখি — ধর্মীয় উন্মাদনা, জাতীয়তাবাদ, লিঙ্গবিদ্বেষ, কিংবা মতবিরোধীদের দমন — এইসব প্রবণতা এখনো সমাজে প্রবল। রাইখের ভাষায় এগুলো হলো মানুষের চেতনায় ম্যালেরিয়ার জীবাণু — যা শিক্ষা, পরিবার ও মিডিয়ার মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।
আজও রাষ্ট্র বা মতবাদ মানুষকে “চিন্তা নয়, ভয়” দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করে। ফলে রাইখের বিশ্লেষণ আজও একইভাবে প্রাসঙ্গিক — হয়তো আরও বেশি।
উপসংহার: চেতনার মুক্তিই বিপ্লবের শুরু
উইলহেল্ম রাইখ দেখিয়েছেন—মতাদর্শ কেবল রাজনৈতিক হাতিয়ার নয়, বরং এক মানসিক সংক্রমণ। এই সংক্রমণ দমন, অপরাধবোধ ও যৌন নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে গড়ে ওঠে এবং সমাজে “আনুগত্যের সংস্কৃতি” প্রতিষ্ঠা করে।
রাইখের চোখে মুক্তি মানে হলো—নিজের অনুভূতিকে চিনে নেওয়া, দমন থেকে মুক্ত হওয়া, এবং চেতনার রোগ থেকে সমাজকে সুস্থ করা।
তিনি যেন আমাদের মনে করিয়ে দেন—
“Wherever fear rules the body, ideology rules the mind.”
অর্থাৎ, যেখানে শরীর ভয়ে কাঁপে, সেখানে চিন্তা স্বাধীন থাকে না।
আর সেইজন্যই, চেতনার এই ম্যালেরিয়া থেকে মুক্তি মানেই প্রকৃত মানব-মুক্তি।
✴️ সংক্ষিপ্ত সূত্র ও রেফারেন্স:
- Reich, Wilhelm. The Mass Psychology of Fascism. 1933.
- Dunn, Patrick. A Radicalization of Reich. The Anarchist Library.
- Brooklyn Rail (2020): “Wilhelm Reich’s The Mass Psychology of Fascism.”
- Platypus Review Archive: Reich’s political psychology readings.
- Wikipedia: Orgastic Potency.
Comments
Leave a comment Cancel reply
More posts
Source: BASFD Bangladesh
