রাষ্ট্র, পুঁজিবাদ ও সমাজতন্ত্রের ব্যর্থতা এবং এনার্কিস্ট বিকল্প: মুক্ত ফেডারেটিভ সমাজের পথে
in
ভূমিকা
মানব সভ্যতার ইতিহাস জুড়ে মানুষ ন্যায়বিচার, সমতা এবং স্বাধীনতার জন্য লড়াই করেছে। দাসপ্রথা থেকে শুরু করে সামন্তবাদ, পুঁজিবাদ থেকে রাষ্ট্রকেন্দ্রিক সমাজতন্ত্র—প্রত্যেক ব্যবস্থাই একসময় মানুষের মুক্তি ও কল্যাণের নামে আবির্ভূত হয়েছে। কিন্তু ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, এই ব্যবস্থাগুলোর অধিকাংশই শেষ পর্যন্ত দমন, শোষণ এবং কর্তৃত্বের যন্ত্রে পরিণত হয়েছে। পুঁজিবাদ মানুষের শ্রমশক্তিকে পণ্যে পরিণত করেছে, আর রাষ্ট্রকেন্দ্রিক সমাজতন্ত্র মানুষের স্বাধীনতাকে রাষ্ট্রীয় আমলাতন্ত্রের কাছে বন্দী করেছে।
এই পরিপ্রেক্ষিতে, এনার্কিস্ট দার্শনিক বিপ্লবীরা এক ভিন্ন ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখিয়েছেন—রাষ্ট্রবিহীন, মুক্ত, সহযোগিতামূলক ও ফেডারেটিভ সমাজের। তাদের বক্তব্য, সত্যিকারের মুক্তি সম্ভব তখনই, যখন মানুষ নিজেকে রাষ্ট্র ও শ্রেণির শৃঙ্খল থেকে মুক্ত করবে। মিখাইল বাকুনিন, পিয়ের-জোসেফ প্রুধোঁ, পিটার ক্রোপটকিন, এমা গোল্ডম্যান এবং অন্যান্য এনার্কিস্টরা এই বিকল্প দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেছেন, যা আজও সমসাময়িক বিশ্বে প্রাসঙ্গিক।
পুঁজিবাদ ও রাষ্ট্রকেন্দ্রিক সমাজতন্ত্রের ব্যর্থতা
পুঁজিবাদ একদিকে উৎপাদনশীলতা বাড়ালেও, অন্যদিকে শ্রমিক ও কৃষকদের ওপর চরম শোষণ চাপিয়েছে। মার্ক্স নিজেও বলেছেন, পুঁজিবাদের মধ্যে অন্তর্নিহিত সংকট আছে যা সামাজিক বৈষম্য বাড়ায়। কিন্তু সমাজতন্ত্রের নামে সোভিয়েত ইউনিয়ন বা চীনে যে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা গড়ে ওঠে, তা মুক্তির বদলে নতুন ধরনের শৃঙ্খল তৈরি করে।
বাকুনিন এ বিষয়ে পূর্বাভাস দিয়েছিলেন:
“যদি রাষ্ট্রকেন্দ্রিক সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়, তবে নতুন এক শ্রেণি—আমলাতন্ত্র—উদ্ভূত হবে, যারা শ্রমিকদের প্রভু হয়ে দাঁড়াবে।”
সোভিয়েত রাশিয়া, মাওবাদী চীন বা উত্তর কোরিয়া এই আশঙ্কাকে সত্যি করে তুলেছে। সমাজতন্ত্রের নামে সেখানে তৈরি হয়েছে দমনমূলক রাষ্ট্রযন্ত্র, যা জনগণের মুক্তি নয় বরং তাদের চিন্তা ও জীবনের উপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে। ফলে, শ্রমিক ও কৃষকরা ক্ষমতার অংশীদার না হয়ে, আবারও পরিণত হয়েছেন রাষ্ট্রের যন্ত্রের দাসে।
এনার্কিস্টদের বিকল্প দৃষ্টিভঙ্গি
এনার্কিস্ট চিন্তাবিদরা বিশ্বাস করেন, মানুষের মুক্তি রাষ্ট্র বা কোনো কর্তৃত্ববাদী ব্যবস্থার মাধ্যমে সম্ভব নয়। তারা প্রস্তাব করেছেন বিকেন্দ্রীকৃত, স্বেচ্ছাসেবী, সহযোগিতাভিত্তিক ফেডারেটিভ সমাজের মডেল।
- প্রুধোঁ বলেছিলেন: “Property is theft” (সম্পত্তি মানেই চুরি)।
তার মতে, ব্যক্তিমালিকানা এবং রাষ্ট্র উভয়ই মানুষের শোষণের মাধ্যম। তিনি এমন এক সমাজের স্বপ্ন দেখেছিলেন যেখানে উৎপাদন ও বণ্টন হবে পারস্পরিক সহযোগিতা ও সমঝোতার ভিত্তিতে। - বাকুনিন জোর দিয়েছিলেন: “Freedom without socialism is privilege and injustice. Socialism without freedom is slavery and brutality.”
তার দৃষ্টিতে, সমাজতন্ত্র ও স্বাধীনতা অবিচ্ছেদ্য। রাষ্ট্রের মাধ্যমে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার চেষ্টা সর্বদা স্বৈরতন্ত্রে পরিণত হবে। - ক্রোপটকিন, তার গ্রন্থ Mutual Aid-এ যুক্তি দেন যে প্রকৃতির বিবর্তনে প্রতিযোগিতার চেয়ে সহযোগিতাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। “Mutual aid is as much a law of nature as mutual struggle.”
মানুষের সমাজে সহযোগিতা ও সংহতি—এসবই প্রকৃতির স্বাভাবিক ধারা, তাই রাষ্ট্র ছাড়াই সমতা ও ঐক্য সম্ভব। - এমা গোল্ডম্যান রাষ্ট্র ও কর্তৃত্বের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন: “The State is not a thing that can be destroyed by a revolution, but a condition, a certain relationship between human beings.”
অর্থাৎ রাষ্ট্র কেবল একটি প্রতিষ্ঠান নয়, বরং সম্পর্কের একটি কাঠামো, যা মানুষের স্বাধীনতাকে খর্ব করে। - এরিকো মালাতেস্তা বলেছিলেন: “Anarchy is society organized without authority.”
তিনি এনার্কিজমকে বিশৃঙ্খলা নয় বরং স্বেচ্ছাসেবী ঐক্যের ভিত্তিতে গঠিত সমাজব্যবস্থা হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন।
মুক্ত ফেডারেটিভ সমাজের কাঠামো
এনার্কিস্টরা এমন এক সমাজ কল্পনা করেন যেখানে—
- রাষ্ট্র থাকবে না: কোনো কেন্দ্রীভূত কর্তৃত্ব, সেনাবাহিনী বা আমলাতন্ত্র থাকবে না।
- ফেডারেশন: স্থানীয় পর্যায়ের স্বশাসিত কমিউন বা সমিতিগুলো পারস্পরিক সহযোগিতার ভিত্তিতে ফেডারেশনে যুক্ত হবে।
- সরাসরি গণতন্ত্র: প্রতিনিধি-ভিত্তিক নয়, বরং সরাসরি অংশগ্রহণমূলক গণতন্ত্র কার্যকর হবে।
- অর্থনৈতিক সহযোগিতা: উৎপাদন ও বণ্টন পারস্পরিক সহযোগিতা ও সম্মিলিত মালিকানার ভিত্তিতে হবে।
- স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন: মানুষ স্বাধীনভাবে নিজেদের প্রয়োজন ও স্বার্থে সংগঠিত হবে।
এই ধারণার মূল শক্তি হলো, সমাজের প্রতিটি মানুষ সমানভাবে ক্ষমতা ও দায়িত্বে অংশ নেবে।
ইতিহাস থেকে শিক্ষা
- রাশিয়া: ১৯১৭ সালের বলশেভিক বিপ্লব প্রথমে শ্রমিকদের হাতে ক্ষমতা দিলেও, দ্রুতই তা পার্টির নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। সোভিয়েত রাষ্ট্র জনগণকে মুক্ত না করে দমনমূলক যন্ত্রে পরিণত হয়।
- চীন: মাওবাদী বিপ্লব কৃষকদের মুক্তির কথা বললেও, “গ্রেট লিপ ফরওয়ার্ড” ও “কালচারাল রেভোলিউশন” ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ ও দমন সৃষ্টি করে।
- উত্তর কোরিয়া: সমাজতন্ত্রের নামে সেখানে কিম পরিবারতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, যা প্রকৃতপক্ষে রাজতান্ত্রিক স্বৈরশাসন।
এগুলো প্রমাণ করে, রাষ্ট্রকেন্দ্রিক সমাজতন্ত্র এনার্কিস্টদের আশঙ্কা মতোই মানুষের মুক্তি নয়, বরং নতুন শৃঙ্খল তৈরি করে।
সমালোচনা ও চ্যালেঞ্জ
এনার্কিস্ট সমাজের ধারণা অনেক সময় সমালোচিত হয় “অবাস্তব” বা “অরাজকতা” হিসেবে। সমালোচকেরা বলেন, রাষ্ট্র ছাড়া শৃঙ্খলা বজায় রাখা সম্ভব নয়। কিন্তু এনার্কিস্টরা যুক্তি দেন, ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় রাষ্ট্র বরং অধিকাংশ সময় দমন ও যুদ্ধের কারণ হয়েছে।
তবে বাস্তব চ্যালেঞ্জও আছে:
- বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা ও কর্পোরেট শক্তির আধিপত্য।
- সামরিক শক্তি ও প্রযুক্তিগত নিয়ন্ত্রণ।
- দীর্ঘকালীন রাষ্ট্রনির্ভর মানসিকতা থেকে বেরিয়ে আসা।
তবুও, সমসাময়িক বিশ্বে স্থানীয় পর্যায়ের সমবায়, অংশগ্রহণমূলক বাজেট, এবং স্বশাসিত কমিউনের উদাহরণগুলো প্রমাণ করে যে এনার্কিস্ট ভাবনা কেবল কল্পনা নয়, বরং বাস্তব বিকল্প হতে পারে।
উপসংহার
রাষ্ট্রকেন্দ্রিক সমাজতন্ত্র যেমন মুক্তি দিতে ব্যর্থ হয়েছে, পুঁজিবাদও তেমনি মানুষের পরাধীনতা বাড়িয়েছে। এই দ্বৈত ব্যর্থতার প্রেক্ষাপটে এনার্কিস্ট দর্শন আমাদের সামনে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে—একটি রাষ্ট্রবিহীন, মুক্ত, সহযোগিতামূলক ও গণতান্ত্রিক ফেডারেটিভ সমাজ।
যেমন বাকুনিন সতর্ক করেছিলেন, রাষ্ট্রীয় সমাজতন্ত্র কেবল নতুন প্রভুর জন্ম দেবে। আর যেমন ক্রোপটকিন, প্রুধোঁ বা এমা গোল্ডম্যান স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন, মানুষের প্রকৃত মুক্তি আসবে কেবল তখনই, যখন সমাজ গড়ে উঠবে পারস্পরিক সহযোগিতা, সমতা ও স্বাধীনতার ভিত্তিতে।
আজকের পৃথিবীতে, যেখানে পুঁজিবাদী শোষণ ও রাষ্ট্রীয় দমন একসঙ্গে বিরাজ করছে, সেখানে এনার্কিস্ট বিকল্প ভাবনা কেবল ইতিহাসের স্মারক নয়, বরং ভবিষ্যতের মুক্তির আহ্বান।
এ কে এম শিহাব, আইনজীবী, বাংলাদেশ
Comments
Leave a comment Cancel reply
More posts
Source: BASFD Bangladesh
