সাম্রাজ্যের রক্তচক্র ভাঙো: নৈরাজ্যবাদী বিপ্লব ও মুক্ত মানবতার ডাক

Written by

in


এডভোকেট এ কে এম শিহাব

ভূমিকা

তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলো বহু দশক ধরে সাম্রাজ্যবাদী শক্তির লুণ্ঠন, আগ্রাসন ও শাসন পরিবর্তন–এর রাজনীতির শিকার। আফগানিস্তান, ইরাক, লিবিয়া, সিরিয়ার মতো দেশগুলোতে “গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা”র নামে আগ্রাসন চালানো হয়েছে, কিন্তু এর ফল হয়েছে ধ্বংস, হত্যা ও গণউদ্বাস্তু। সাম্রাজ্যবাদ কেবল অর্থনৈতিক নয়, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক আধিপত্যও প্রতিষ্ঠা করেছে।

কিন্তু এই সংকটের মূল উৎস কেবল সাম্রাজ্যবাদ নয়; রাষ্ট্র নামক কাঠামোও সমানভাবে দায়ী। রাষ্ট্র সর্বদা দমন ও শোষণের যন্ত্র, আর সাম্রাজ্যবাদ হলো সেই দমনের বৈশ্বিক রূপ। এ কারণেই নৈরাজ্যবাদীরা রাষ্ট্রের পরিবর্তে মুক্ত, সহযোগিতামূলক ও রাষ্ট্রহীন সমাজের বিকল্প কল্পনা করেছেন।


রাষ্ট্র: আধিপত্য ও দাসত্বের যন্ত্র

মিখাইল বাকুনিন রাষ্ট্র সম্পর্কে বলেছিলেন:

“রাষ্ট্রের অস্তিত্বের অর্থই হলো আধিপত্য; আর আধিপত্য মানেই দাসত্ব।” (Bakunin, Statism and Anarchy, 1873)

রাষ্ট্র কখনোই নিরপেক্ষ নয়। এটি শ্রেণিশক্তি ও অভিজাতদের আধিপত্য বজায় রাখে। একবার রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হলে তা জনগণের উপরই দাঁড়ায়, জনগণের জন্য নয়। সাম্রাজ্যবাদ রাষ্ট্রকে ব্যবহার করে এক জাতিকে আরেক জাতির শোষণের যন্ত্রে পরিণত করে।


নৈরাজ্যবাদী বিকল্প: সহযোগিতা ও স্বাধীন কমিউন

পিওতর ক্রপটকিন তার বিখ্যাত গ্রন্থ Mutual Aid: A Factor of Evolution (1902)-এ দেখিয়েছেন যে মানবসভ্যতার বিকাশে প্রতিযোগিতার চেয়ে সহযোগিতা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তিনি লিখেছিলেন:

“মানব অগ্রগতির চালিকা শক্তি প্রতিযোগিতা নয়, বরং পারস্পরিক সহযোগিতা।”

এমা গোল্ডম্যান (1869–1940), নৈরাজ্যবাদের অন্যতম প্রবক্তা, স্বাধীনতা সম্পর্কে বলেছিলেন:

“স্বাধীনতা দেওয়া যায় না; স্বাধীনতা মানুষকে নিজের শক্তি দিয়ে নিতে হয়।” (Goldman, Anarchism and Other Essays, 1910)

তার মতে, রাষ্ট্র বা এমনকি সংসদীয় গণতন্ত্রও জনগণকে প্রকৃত স্বাধীনতা দেয় না, বরং নতুন শৃঙ্খলে আবদ্ধ করে।

অন্যদিকে মারে বুকচিন (1921–2006) রাষ্ট্রকেন্দ্রিক রাজনীতির পরিবর্তে কমিউনালিজম বা লিবার্টারিয়ান মিউনিসিপালিজম–এর ধারণা দিয়েছিলেন। তিনি বলেন:

“প্রকৃত গণতন্ত্র তখনই সম্ভব, যখন ক্ষমতা উপরের থেকে নিচে নয়, বরং নিচের থেকে উপরের দিকে প্রবাহিত হয়।” (Bookchin, The Next Revolution: Popular Assemblies and the Promise of Direct Democracy, 2015)

অতএব, নৈরাজ্যবাদী বিকল্প হলো ফেডারেটিভ সমাজ—যেখানে স্থানীয় সম্প্রদায়গুলো প্রত্যক্ষ গণতন্ত্রের মাধ্যমে নিজেদের সিদ্ধান্ত নেবে এবং বৃহত্তর স্তরে স্বেচ্ছায় একে অপরের সাথে যুক্ত থাকবে।


বিপ্লব: ক্ষমতা দখল নয়, ক্ষমতার অবসান

ইতিহাস দেখায়, যে বিপ্লব কেবল নতুন শাসক আনে, তারা শেষ পর্যন্ত পুরনো শোষণকেই নতুন রূপে ফিরিয়ে আনে। ফরাসি বিপ্লব থেকে শুরু করে রাশিয়ার অক্টোবর বিপ্লব পর্যন্ত এর উদাহরণ রয়েছে।

বাকুনিন সতর্ক করে বলেছিলেন:

“যদি বিপ্লবীরা রাষ্ট্র দখল করে, তারা অচিরেই নতুন অত্যাচারীতে পরিণত হবে।” (Bakunin, God and the State, 1882)

এ কারণেই নৈরাজ্যবাদী বিপ্লবের লক্ষ্য রাষ্ট্র দখল নয়, বরং রাষ্ট্র ধ্বংস—ক্ষমতার অবসান, নতুন ক্ষমতা নয়।


সাম্রাজ্যবাদ ও প্রতিরোধ

সাম্রাজ্যবাদ কেবল অর্থনৈতিক লুণ্ঠনই করে না; এটি সাংস্কৃতিক আধিপত্যও প্রতিষ্ঠা করে। স্থানীয় জনগণকে নিজেদের ঐতিহ্য ও ইতিহাস থেকে বিচ্ছিন্ন করে বিদেশি সংস্কৃতি চাপিয়ে দেয়।

এমা গোল্ডম্যান যেমন লিখেছিলেন:

“রাষ্ট্র হলো সংগঠিত শক্তি, কিন্তু তা সর্বদা জনগণের স্বাধীনতার বিরুদ্ধে ব্যবহৃত হয়েছে।” (Anarchism and Other Essays, 1910)

অতএব, সাম্রাজ্যবাদবিরোধী প্রতিরোধ মানেই রাষ্ট্রবিরোধী প্রতিরোধ। জনগণকে নিজেদের বিকল্প সংগঠন—শ্রমিক পরিষদ, কৃষক কমিউন, স্থানীয় সমবায়—গড়ে তুলতে হবে। এভাবেই রাষ্ট্রহীন সমাজের বীজ রোপিত হবে।


উপসংহার

আজকের পৃথিবীতে সাম্রাজ্যবাদ “গণতন্ত্র”–এর মুখোশ পরে আসলেও তা কেবল ধ্বংস ও দমন ডেকে আনে। রাষ্ট্র এই দমনের ভিত্তি, আর সাম্রাজ্যবাদ তার আন্তর্জাতিক রূপ।

এমা গোল্ডম্যান যেমন বলেছিলেন:

“আমি এমন এক সমাজ চাই যেখানে প্রত্যেক মানুষ নিজের জীবন নিজের মতো করে গড়তে পারবে, কারও নির্দেশে নয়।”

আর বুকচিন আমাদের মনে করিয়ে দেন:

“প্রকৃত গণতন্ত্র মানে প্রত্যেক নাগরিকের নিজের সম্প্রদায়ে সরাসরি কণ্ঠস্বর থাকা।”

সুতরাং, আজকের জরুরি কাজ হলো সাম্রাজ্যবাদী শৃঙ্খল ভাঙা, রাষ্ট্রের মায়া ভেঙে ফেলা এবং পারস্পরিক সহযোগিতা, প্রত্যক্ষ গণতন্ত্র ও মুক্ত মানবতার উপর ভিত্তি করে রাষ্ট্রহীন এক নতুন সমাজ গড়ে তোলা। এটাই নৈরাজ্যবাদী বিপ্লবের ডাক।


রেফারেন্স

  1. Bakunin, Mikhail. Statism and Anarchy. 1873.
  2. Bakunin, Mikhail. God and the State. 1882.
  3. Kropotkin, Peter. Mutual Aid: A Factor of Evolution. 1902.
  4. Goldman, Emma. Anarchism and Other Essays. 1910.
  5. Bookchin, Murray. The Next Revolution: Popular Assemblies and the Promise of Direct Democracy. Verso, 2015.

Comments

Leave a comment Cancel reply


Source: BASFD Bangladesh

Laisser un commentaire