ধর্ম ও লিবার্টারিয়ান কমিউনিস্ট সমাজ : নৈরাজ্যবাদী দৃষ্টিকোণ
in
ভূমিকা
নৈরাজ্যবাদ (Anarchism) মূলত এক দার্শনিক ও রাজনৈতিক দর্শন, যার কেন্দ্রবিন্দু হলো সব ধরণের অন্যায্য কর্তৃত্ব ও শ্রেণিবিভাজন ভেঙে ফেলা। রাষ্ট্র, পুঁজিবাদ কিংবা গির্জা—যে প্রতিষ্ঠানই মানুষের স্বাধীনতা হরণ করে, নৈরাজ্যবাদ তার বিরোধিতা করে। তাই প্রশ্ন ওঠে, একটি লিবার্টারিয়ান কমিউনিস্ট সমাজে (যেখানে উৎপাদন ও সম্পদ সামষ্টিক মালিকানায়, আর সম্পর্ক গড়ে ওঠে স্বাধীন সহযোগিতার ভিত্তিতে) ধর্মের স্থান কোথায়?
নৈরাজ্যবাদী দৃষ্টিতে ধর্মকে একইসাথে দেখা হয় দুইভাবে—
১. প্রতিষ্ঠান হিসেবে ধর্ম: যা ঐতিহাসিকভাবে রাষ্ট্র ও শোষণের হাতিয়ার হয়েছে।
২. ব্যক্তিগত বিশ্বাস হিসেবে ধর্ম: যা স্বাধীনতার শর্তে সহনীয় ও ব্যক্তিগত ব্যাপার।
এই দ্বিমুখী অবস্থানই আমাদের আলোচনার মূল ভিত্তি।
কর্তৃত্ব ও ধর্মের সমালোচনা
মিখাইল বকুনিন ধর্মের প্রতি সবচেয়ে কঠোর নৈরাজ্যবাদী সমালোচকদের একজন। তিনি বলেছিলেন—
“যদি ঈশ্বর থাকেন তবে মানুষ দাস হয়; আর মানুষ মুক্ত হতে পারে এবং তা উচিত ও —তাই ঈশ্বর থাকতে পারেন না।” (God and the State, ১৮৮২)
বকুনিনের মতে, ঈশ্বরের ধারণা কেবল আধ্যাত্মিক নয়, বরং রাজনৈতিক। ঈশ্বরের নামে গির্জা ও ধর্মীয় কর্তৃপক্ষ যুগ যুগ ধরে রাজতন্ত্র, সামন্ততন্ত্র ও রাষ্ট্রীয় দমনকে ন্যায্যতা দিয়েছে। ফলে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান মানুষকে স্বাধীন নাগরিক নয়, বরং অনুগত প্রজা বানিয়েছে।
এমা গোল্ডম্যানও একই সুরে বলেছিলেন—
“খ্রিস্টধর্মের বিনয়, আত্মত্যাগ আর আনুগত্যের শিক্ষা কেবল শাসক শ্রেণির স্বার্থ রক্ষা করেছে।” (The Failure of Christianity, ১৯১৩)
তার মতে, ধর্ম, রাষ্ট্র ও পুঁজিবাদ—সবই একই বন্ধনে গাঁথা, যা মানুষকে বিদ্রোহ থেকে বিরত রাখে।
ব্যক্তিগত বিশ্বাস ও স্বাধীনতা
তবে নৈরাজ্যবাদ কেবল ধর্মের বিরুদ্ধে একরোখা যুদ্ধ ঘোষণা করে না। এরিকো মালাতেস্তা যেমন বলেছিলেন—
“আমরা জবরদস্তির বিরোধিতা করি। প্রত্যেকের স্বাধীনতা থাকা উচিত কী ভাববে আর কী বিশ্বাস করবে সে ব্যাপারে।” (Anarchy, ১৮৯১)
অর্থাৎ, ধর্ম যখন রাজনৈতিক বা প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষমতার হাতিয়ার, তখন তা ভেঙে ফেলতে হবে। কিন্তু কেউ যদি ব্যক্তিগতভাবে বিশ্বাস করে বা স্বেচ্ছায় আধ্যাত্মিক চর্চা করে, তবে তা তার ব্যক্তিগত অধিকার।
পিওতর ক্রোপটকিনও স্বীকার করেছিলেন যে অনেক ধর্মীয় ঐতিহ্য পারস্পরিক সাহায্য ও সামষ্টিক নৈতিকতার বীজ বহন করেছে। তবে তাঁর মতে নৈতিকতার উৎস কোনো ঈশ্বরীয় আদেশ নয়, বরং মানুষের সামাজিক জীবন ও সহযোগিতা। তিনি লিখেছিলেন—
“নৈতিকতা কোনো অতিপ্রাকৃত উৎস থেকে আসেনি; এটি এসেছে পারস্পরিক সহায়তার প্রয়োজন থেকে।” (Ethics: Origin and Development, ১৯২৪)
নৈতিকতা, সংহতি ও ধর্মের স্থান
নৈরাজ্যবাদীরা মনে করেন, একটি লিবার্টারিয়ান কমিউনিস্ট সমাজে নৈতিক শৃঙ্খলার জন্য ধর্মের প্রয়োজন নেই। পারস্পরিক সহযোগিতা, সংহতি ও স্বাধীন যোগসূত্রই যথেষ্ট ভিত্তি। ক্রোপটকিনের ভাষায়—
“সহযোগিতা, প্রতিযোগিতা নয়—এই শক্তিই মানুষকে টিকিয়ে রেখেছে।” (Mutual Aid, ১৯০২)
তবে, যদি কোনো ধর্মীয় সম্প্রদায় স্বেচ্ছায়, আধিপত্য ও বিশেষাধিকার ছাড়াই নিজেদের চর্চা চালায়, তবে তা সহাবস্থানে বাধা নয়। নৈরাজ্যবাদ এই স্বাধীনতাকেই রক্ষা করে।
লিবার্টারিয়ান কমিউনিস্ট সমাজে ধর্মের অবস্থান
একটি মুক্ত সমাজে—
- কোনো রাষ্ট্রধর্ম থাকবে না।
- কোনো ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান রাজনৈতিক ক্ষমতা বা বিশেষাধিকার ভোগ করবে না।
- শিক্ষা হবে মুক্তচিন্তা ও সমালোচনামূলক বোধের উপর ভিত্তি করে।
- ব্যক্তি ইচ্ছেমতো বিশ্বাস করবে বা অবিশ্বাস করবে—তাতে জবরদস্তি থাকবে না।
এখানে ধর্ম প্রতিষ্ঠানের হাতিয়ার নয়, বরং ব্যক্তিগত বা সামষ্টিক সাংস্কৃতিক অভিব্যক্তি হয়ে উঠবে।
উপসংহার
বকুনিন, গোল্ডম্যান, ক্রোপটকিন কিংবা মালাতেস্তা—সবাই দেখিয়েছেন যে ধর্ম, যখন প্রতিষ্ঠান ও কর্তৃত্বে পরিণত হয়, তখন তা শোষণের বাহন। তবে নৈরাজ্যবাদ একসাথে ব্যক্তির স্বাধীন চিন্তা ও বিশ্বাসকেও রক্ষা করে।
অতএব, লিবার্টারিয়ান কমিউনিস্ট সমাজে ধর্মের স্থান হবে কেবলমাত্র ব্যক্তিগত ও স্বেচ্ছাসেবী চর্চার মধ্যে সীমাবদ্ধ, কখনোই ক্ষমতার যন্ত্র হিসেবে নয়। এভাবেই নৈরাজ্যবাদ একদিকে ধর্মকে কর্তৃত্ব থেকে মুক্ত করে, অন্যদিকে চিন্তা ও বিশ্বাসের স্বাধীনতাকে রক্ষা করে—যা একটি সত্যিকারের মুক্ত সমাজের শর্ত।
সূত্র:
- বকুনিন, মিখাইল। God and the State. ১৮৮২।
- গোল্ডম্যান, এমা। The Failure of Christianity. ১৯১৩।
- ক্রোপটকিন, পিওতর। Mutual Aid: A Factor of Evolution. ১৯০২।
- ক্রোপটকিন, পিওতর। Ethics: Origin and Development. ১৯২৪।
- মালাতেস্তা, এরিকো। Anarchy. ১৮৯১।
Comments
Leave a comment Cancel reply
More posts
Source: BASFD Bangladesh
