‘নিজস্বতা’ ও স্বাধীনতার সীমানা: এনার্কিজমের আলোকে স্টার্নারের আত্মমুক্তির দর্শন
ভূমিকা
নৈরাজ্যবাদ (Anarchism) বহু পরিপ্রেক্ষিতে রাষ্ট্রবিরোধী বা কর্তৃত্ববিরোধী আদর্শ হিসেবে পরিচিত হলেও, এর গভীরতর ভাবনার কেন্দ্রে রয়েছে ব্যক্তি স্বাধীনতার চূড়ান্ত স্বীকৃতি। এই স্বাধীনতা কেবল বাহ্যিক শাসন বা রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে নয়, বরং অন্তর্গত মানসিক, নৈতিক ও আত্মিক বন্ধনের বিরুদ্ধেও। এই জায়গায় ম্যাক্স স্টার্নারের চিন্তা বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ, যিনি তার গ্রন্থ The Ego and Its Own-এ ‘নিজস্বতা’ (Eigenheit) ও স্বার্থপরতার (egoism) মাধ্যমে এক নতুন ধরনের মুক্তির ধারণা উন্মোচন করেন।
স্টার্নারের ‘নিজস্বতা’ বনাম কর্তব্যমুখিতা
স্টার্নারের মতে, ব্যক্তি তখনই সত্যিকার অর্থে মুক্ত, যখন সে নিজেই নিজের মালিক—নিজের চিন্তা, আকাঙ্ক্ষা ও কাজের উপর পূর্ণ কর্তৃত্ব রাখে। তিনি বলেন,
“আমি তখনই আমার নিজের, যখন আমি আমার উপর কর্তৃত্ব করি—অন্য কিছুর দ্বারা নয়।” (The Ego and Its Own, পৃ. ১৫৩)
স্টার্নার এই বক্তব্যের মাধ্যমে কেবল রাষ্ট্র বা ধর্মের আধিপত্যের বিরুদ্ধে কথা বলেননি, বরং ব্যক্তি যে নিজেরই ধারণা, ইচ্ছা বা নৈতিকতার দ্বারা পরাধীন হতে পারে—সেই কথাও বলেছেন। এ জায়গায় তিনি ক্যান্টীয় ‘স্বনিয়ন্ত্রিত নৈতিকতা’ (self-legislated morality) বা রুশোর ‘সামাজিক চুক্তি’র ধারণা প্রত্যাখ্যান করেন। তিনি বলেন:
“একটি আইনের প্রতি আনুগত্য, এমনকি নিজের তৈরি আইনের প্রতিও, আসলে এক ধরনের আত্মবিরোধিতা, কারণ পরের মুহূর্তেই আমি তা অমান্য করতে পারি।” (পৃ. ১৭৪)
এই মতবাদের মূলে রয়েছে ধারণা যে, স্বাধীনতা মানে কোনো নিয়মে আবদ্ধ হওয়া নয়, বরং তা হলো সকল বন্ধন ও কর্তব্যের ঊর্ধ্বে গিয়ে নিজের ইচ্ছার পূর্ণ বাস্তবায়ন।
এনার্কিজমের সঙ্গে স্টার্নারের সম্পর্ক
যদিও স্টার্নারকে সরাসরি ‘এনার্কিস্ট’ বলা যায় না, তথাপি তার চিন্তা পরবর্তীতে স্বতন্ত্রতাবাদী (individualist anarchism) ধারার উপর গভীর প্রভাব ফেলে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের চিন্তাবিদ বেঞ্জামিন টাকার বলেন,
“স্টার্নার ছিলেন একমাত্র ব্যক্তি যিনি নিঃসঙ্কোচে ঘোষণা করেছিলেন—মানুষের কোনো কর্তব্য নেই, এমনকি নিজের প্রতিও না।”
স্টার্নারের চিন্তা এনার্কিজমের সেই ধারার প্রতিনিধিত্ব করে যেখানে ব্যক্তি স্বাধীনতা পূর্ণ মাত্রায় স্বীকৃত এবং কর্তব্য, নৈতিকতা, সামাজিক বন্ধন—সবকিছুই প্রশ্নবিদ্ধ। তার মতে, যেকোনো আদর্শ বা আবেগ যা ব্যক্তিকে নিজের চেয়ে বড় করে তোলে, তা-ই হলো এক ধরনের পরাধীনতা। যেমন, তিনি লোভী ব্যক্তিকে সমালোচনা করে বলেন:
“যে ব্যক্তি ধনের জন্য সবকিছু ত্যাগ করে, সে আর নিজের জন্য কাজ করছে না; ধনই তার প্রভু হয়ে গেছে।” (পৃ. ৫৮)
আত্মনিয়ন্ত্রণ ও অভ্যন্তরীণ স্বাধীনতা
স্টার্নারের আত্মমুক্তির ধারণা কেবল রাষ্ট্র বা সমাজের শৃঙ্খলের বিরুদ্ধে নয়, বরং আত্মবীক্ষণ এবং অন্তরশক্তির ওপরও জোর দেয়। তিনি বলেন,
“যদি কোনো চিন্তা বা ইচ্ছা আমাকে এতটাই অধিকার করে ফেলে যে আমি তার দাস হয়ে পড়ি, তাহলে আমি এক ‘অধিষ্ঠিত’ মানুষে পরিণত হই।” (পৃ. ১২৭)
এই ধারণা বৌদ্ধ দর্শনের ‘আসক্তিমুক্তি’র সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ। তবে স্টার্নার এটিকে একটি অস্তিত্ববাদী আত্মনির্মাণের মাধ্যমে উপস্থাপন করেন, যেখানে ব্যক্তি নিজেকে গড়েন নিজের ইচ্ছার অনুসারে—না কোনো নৈতিকতা, না কোনো কর্তব্য, না কোনো ঈশ্বরের ভয় থেকে।
সমালোচনা ও মূল্যায়ন
অনেকেই স্টার্নারের ভাবনাকে নৈরাজ্যবাদের চরম রূপ বলে মনে করেন, কারণ এটি সামাজিক দায়বদ্ধতা, সম্মান বা পারস্পরিক নির্ভরতাকে অস্বীকার করে। পিটার ক্রোপটকিনের মতো সমাজ-ভিত্তিক এনার্কিস্টদের কাছে এটি আত্মকেন্দ্রিকতা ও নিঃস্বার্থ পারস্পরিক সহযোগিতার বিপরীত। তবে স্টার্নারের অবদান ছিল এই যে, তিনি ব্যক্তি-স্বাধীনতার গভীর দর্শন দাঁড় করিয়েছিলেন এবং দেখিয়েছিলেন, কিভাবে বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ দুই রকম শাসন-ই ব্যক্তির ‘নিজস্বতা’ দমন করে।
উপসংহার
ম্যাক্স স্টার্নারের চিন্তা আমাদের মনে করিয়ে দেয়—মুক্তি কেবল রাষ্ট্র বা সমাজ থেকে নয়, বরং নিজস্ব মানসিক কাঠামো থেকেও অর্জন করতে হয়। এনার্কিজমের মূলতত্ত্ব যেখানে কর্তৃত্বের অনুপস্থিতি, সেখানে স্টার্নার যুক্ত করেন—কোনো কর্তব্য বা ধ্রুব বিশ্বাস থাকাও এক ধরনের কর্তৃত্ব। তাই, তার ‘নিজস্বতা’ একটি অন্তরঙ্গ স্বাধীনতা, যা ব্যক্তি নিজের ইচ্ছা ও উপলব্ধির উপর দাঁড়িয়ে গড়ে তোলে নিজের সত্তা। এনার্কিস্ট আদর্শে এটি এক মৌলিক দর্শন, যা ব্যক্তি-স্বাধীনতার চূড়ান্ত রূপকে প্রতিনিধিত্ব করে।
Comments
Leave a comment Cancel reply
More posts
Source: BASFD Bangladesh
