টাকা-বিহীন সমাজ: এক বিপ্লবী এনার্কিস্ট দৃষ্টিভঙ্গি

Written by

in


একটি ন্যায়ভিত্তিক ও সমানতামূলক সমাজের কল্পনায়, টাকা-বিহীন সমাজের ধারণা অনেকের কাছে এক গভীর মানবিক আকাঙ্ক্ষা হিসেবে বিবেচিত হয়। এনার্কিস্টদের (বিশেষ করে এনার্কো-কমিউনিস্টদের) দৃষ্টিতে, টাকার বিলুপ্তি কোনো কল্পনালব্ধ স্বপ্ন নয়—বরং এটি একটি স্বাধীন ও সহযোগিতামূলক সমাজ গঠনের অপরিহার্য ধাপ। যদিও একটি সম্পূর্ণ টাকা-বিহীন অর্থব্যবস্থা গড়ে তোলা জটিল, তবুও এনার্কিস্ট তত্ত্ব আমাদেরকে দার্শনিক ভিত্তি এবং বাস্তবধর্মী পথনির্দেশনা দেয় এই ব্যবস্থার দিকে এগিয়ে যাওয়ার জন্য।

পুঁজিবাদী সমাজে টাকার ভূমিকা

পুঁজিবাদী প্রেক্ষাপটে, টাকা শুধু একটি নিরপেক্ষ বিনিময় মাধ্যম নয়। এটি এক ধরনের বিমূর্ত শক্তি, যা শ্রম, প্রকৃতি এবং সামাজিক সম্পর্ককে পণ্য রূপে পরিণত করে। পুঁজিবাদে, টাকা ব্যবহৃত হয় শ্রমিকদের শ্রম থেকে উদ্বৃত্ত মূল্য (surplus value) আহরণ করার জন্য এবং এর মাধ্যমে শ্রেণি-বিভক্ত, বৈষম্যমূলক ও শোষণমূলক কাঠামো গঠিত হয়।

এনার্কিস্টদের মতে, টাকা এবং মুনাফাভিত্তিক লেনদেন টিকে থাকলে শোষণও টিকে থাকে—even যদি তা সমাজতান্ত্রিক নামে পরিচালিত হয়। প্রকৃত মুক্তির জন্য প্রয়োজন এমন একটি সমাজ, যেখানে উৎপাদন হবে ব্যবহারের জন্য, বিক্রির জন্য নয়; যেখানে প্রয়োজন পূরণ হবে সমতা ও সহযোগিতার ভিত্তিতে, টাকার অঙ্কে নয়।

ইতিহাসের অভিজ্ঞতা ও অনুপ্রেরণা

যদিও এখনো একটি পূর্ণ টাকা-বিহীন সমাজ গঠিত হয়নি, তবুও ইতিহাসে এমন কিছু প্রচেষ্টা দেখা গেছে। ১৯৩৬ সালের স্প্যানিশ বিপ্লব চলাকালীন, কাতালোনিয়া ও আরাগনে এনার্কিস্টরা তাদের নিয়ন্ত্রিত অঞ্চলে টাকা বাতিল করেছিল। শ্রমিক সংগঠনগুলো কারখানা ও জমি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেয় এবং পণ্যের বণ্টন হয় প্রয়োজন অনুযায়ী। কিছু ক্ষেত্রে সাময়িকভাবে টোকেন বা ভাউচার ব্যবহার হলেও, চূড়ান্ত লক্ষ্য ছিল টাকার সম্পূর্ণ বিলুপ্তি।

তাছাড়া অনেক আদিবাসী সমাজ ও প্রথাগত সম্প্রদায় টাকার পরিবর্তে উপহার ভিত্তিক (gift economy) বিনিময় পদ্ধতি অনুসরণ করত, যা আত্মীয়তা, বিশ্বাস ও পারস্পরিক দায়িত্বের ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছিল—পুঁজিবাদী প্রতিযোগিতামূলক ব্যক্তিবাদ থেকে একেবারেই ভিন্ন।

একটি এনার্কিস্ট টাকা-বিহীন সমাজের মূলনীতি

১. উৎপাদনের উপকরণের যৌথ মালিকানা
জমি, কারখানা, যন্ত্রপাতি ও সম্পদ—সবকিছুই হবে জনগণের যৌথ মালিকানাধীন। কেউ এগুলোর মালিক হয়ে ব্যক্তিগত মুনাফার জন্য এগুলো ব্যবহার করতে পারবে না।

২. প্রয়োজনের জন্য উৎপাদন, মুনাফার জন্য নয়
উৎপাদন হবে সামাজিক পরিকল্পনার মাধ্যমে, সকলের প্রয়োজন পূরণের লক্ষ্যে—not বাজারে বিক্রির জন্য বা লভ্যাংশের জন্য।

৩. উপকরণের প্রয়োজনভিত্তিক বা মুক্ত প্রবেশাধিকার ভিত্তিক বণ্টন
পণ্য ও সেবা মানুষ টাকা দিয়ে কিনবে না; তারা প্রয়োজন অনুযায়ী তা সংগ্রহ করবে। বিশ্বাস ও সহযোগিতার উপর ভিত্তি করে এমন সমাজে “কে কত নিল” এ নিয়ে উদ্বেগের দরকার নেই।

৪. বিকেন্দ্রীকৃত পরিকল্পনা ও স্ব-পরিচালন
উৎপাদন ও বণ্টনের পরিকল্পনা করা হবে স্থানীয় পর্যায়ের গণসভা, কাউন্সিল ও স্ব-শাসিত ফেডারেশন দ্বারা—না যে কোনো কেন্দ্রীয় রাষ্ট্র বা বাজার ব্যবস্থা দ্বারা।

৫. পারস্পরিক সহায়তা ও সংহতি
এ সমাজের কেন্দ্রবিন্দু হবে পারস্পরিক সহায়তা (mutual aid)। পিয়েতর ক্রপোটকিনের মতো এনার্কিস্ট দার্শনিকগণ বলেছিলেন, পারস্পরিক সহযোগিতা মানবসমাজের একটি প্রাকৃতিক ও প্রয়োজনীয় ভিত্তি।

টাকা ছাড়া অর্থব্যবস্থায় রূপান্তর: ধাপে ধাপে ও পরীক্ষামূলক পন্থা

টাকা ভিত্তিক সমাজ থেকে হঠাৎ করে টাকা-বিহীন সমাজে পৌঁছানো সম্ভব নয়। এনার্কিস্টরা সাধারণত এই রূপান্তরকে একটি ধ্বংসাত্মক না হয়ে গঠনমূলক বিপ্লবী প্রক্রিয়া হিসেবে কল্পনা করে। কিছু ধাপে এগিয়ে যাওয়া যেতে পারে:

  • সহযোগিতামূলক নেটওয়ার্ক তৈরি, যেমন: কমিউনিটি গার্ডেন, মুক্ত স্কুল, সময় ভিত্তিক বিনিময় (time banks)।
  • ‘ডুয়াল পাওয়ার’ গঠন: বিকল্প ব্যবস্থা গড়ে তোলা যা বর্তমান পুঁজিবাদী কাঠামোর বাইরে দাঁড়িয়ে কাজ করে।
  • সম্পদ দখল ও পুনঃবণ্টন: অব্যবহৃত জমি, ভবন বা কারখানা দখল করে জনগণের ব্যবহারে নিয়ে আসা।
  • মানসিকতার পরিবর্তন: মানুষকে ভোগবাদ থেকে সংহতি ও সমতার সংস্কৃতিতে উত্তরণের মাধ্যমে প্রস্তুত করা।

চ্যালেঞ্জ ও সমালোচনা

অনেকেই মনে করেন, টাকা ছাড়া সমাজে বিশৃঙ্খলা, অলসতা বা অদক্ষতা দেখা দিতে পারে। কিন্তু এনার্কিস্টরা যুক্তি দেন, এসব ভয় আসলে পুঁজিবাদ থেকে জন্ম নেওয়া ভ্রান্ত ধারণা। বাস্তবে, সহযোগিতামূলক পরিবেশে মানুষ প্রায়শই একে অপরের কল্যাণে কাজ করতে প্রস্তুত থাকে। তদুপরি, এনার্কিস্ট ব্যবস্থা বিকেন্দ্রীকরণ ও পারস্পরিক জবাবদিহিতার মাধ্যমে প্রয়োজনীয় শৃঙ্খলা বজায় রাখে।

বর্তমান প্রযুক্তি, যেমন ওপেন সোর্স প্ল্যানিং টুল, ডিজিটাল সমন্বয় প্ল্যাটফর্ম বা স্বশাসিত সাপ্লাই চেইন—এগুলি এমন একটি টাকা-বিহীন সমাজে সহায়ক হতে পারে, যদি সেগুলি ব্যক্তিমালিকানাধীন না হয়ে জনগণের হাতে থাকে।

উপসংহার

টাকা-বিহীন সমাজ, এনার্কিস্ট দৃষ্টিকোণ থেকে, নিছক কল্পনা নয়—এটি পারস্পরিক সহায়তা, যৌথ মালিকানা ও গণতান্ত্রিক স্বশাসনের উপর প্রতিষ্ঠিত একটি বাস্তবসম্মত ভবিষ্যৎ দিশা। এটি পুঁজিবাদী লেনদেন ও শোষণমূলক ব্যবস্থার মূলে আঘাত করে এবং এমন এক পৃথিবীর দুয়ার খুলে দেয়, যেখানে মানুষ তার প্রয়োজন অনুযায়ী জীবনযাপন করতে পারে—বিনা মূল্যেই। আজও বিশ্বজুড়ে বহু ছোট ছোট প্রচেষ্টায় এই স্বপ্ন বাস্তবায়নের দিকে যাত্রা শুরু হয়েছে।


Comments

Leave a comment Cancel reply


Source: BASFD Bangladesh

Laisser un commentaire