মার্ক্সবাদ নিয়ে অ্যানার্কিস্ট সমালোচনা: বিপ্লবী দর্শনের এক মৌলিক বিভাজন
অ্যানার্কিজম ও মার্ক্সবাদ উভয়ই পুঁজিবাদবিরোধী এবং শ্রেণিহীন সমাজ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে অঙ্গীকারবদ্ধ। কিন্তু এই দুটি ধারার মধ্যে বিপ্লব, রাষ্ট্র ও কর্তৃত্ব নিয়ে দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্য অত্যন্ত গভীর। মার্ক্সবাদ যেখানে “শ্রমিক শ্রেণির একনায়কত্ব” ও একটি মধ্যবর্তী রাষ্ট্র ব্যবস্থার মাধ্যমে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার কথা বলে, অ্যানার্কিস্টরা তা প্রত্যাখ্যান করে বলে যে, যেকোনো রাষ্ট্রই কর্তৃত্বের এক রূপ এবং তা জনগণের স্বাধীনতাকে হরণ করে।
১. রাষ্ট্র ও কর্তৃত্ব নিয়ে মূল দ্বন্দ্ব
মার্ক্সবাদের বিরুদ্ধে অ্যানার্কিস্টদের মূল অভিযোগ হলো— রাষ্ট্র কখনোই মানুষের মুক্তির মাধ্যম হতে পারে না। রাষ্ট্র এক ধরণের দমনমূলক কাঠামো, যেটি ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত করে এবং শ্রেণিশাসনের নতুন রূপ সৃষ্টি করে।
মিখাইল বাকুনিন, যিনি প্রাথমিকভাবে মার্ক্সের সহযোগী ছিলেন, পরে তিনিই তার সবচেয়ে বড় সমালোচকে পরিণত হন। তিনি বলেন:
“আপনি যদি একটি রাষ্ট্রকে শ্রমিক শ্রেণির হাতে তুলে দেন, সেটি এখনো একটি রাষ্ট্রই থাকবে এবং সেটি এখনো দমনযন্ত্রই থাকবে। শ্রমিকরা রাষ্ট্রকে বিলোপ করবে না; বরং নিজেরাই নতুন শাসক শ্রেণিতে পরিণত হবে।” — বাকুনিন, “Statism and Anarchy” (১৮৭৩)
তিনি স্পষ্ট করে বলেন:
“তারা (মার্ক্সবাদীরা) দাবি করে যে, কেবল একনায়কত্ব—অবশ্যই তাদের একনায়কত্ব—ই জনগণের জন্য স্বাধীনতা আনতে পারে। আমরা বলি, কেবল স্বাধীনতাই স্বাধীনতা আনতে পারে।”
অর্থাৎ, স্বাধীনতা অর্জনের পথ যদি কর্তৃত্ব দিয়ে শুরু হয়, তাহলে তার শেষও কর্তৃত্বেই শেষ হয়।
২. শ্রমিক শ্রেণির একনায়কত্ব না কি নতুন শাসক শ্রেণি?
মার্ক্সবাদীদের মতে, “proletarian dictatorship” বা শ্রমিক শ্রেণির একনায়কত্ব একটি অস্থায়ী ব্যবস্থা। কিন্তু ইতিহাসে দেখা গেছে, এই ধরণের রাষ্ট্রিক কাঠামোই চূড়ান্তভাবে নতুন শাসক শ্রেণির উত্থান ঘটিয়েছে।
এমা গোল্ডম্যান, যিনি প্রথমে বলশেভিক বিপ্লবকে সমর্থন করলেও, পরে গভীর হতাশা প্রকাশ করেন। তিনি বলেন:
“আমি ভেবেছিলাম নতুন জীবন, নতুন মানুষ, নতুন আদর্শ পাব। কিন্তু আমি পেলাম বলশেভিজম—একটি নতুন অত্যাচার, যেটি রক্তে রাঙিয়ে বিপ্লবকে গলা টিপে হত্যা করেছে।” — Emma Goldman, “My Disillusionment in Russia” (১৯২৩)
অ্যালেক্সান্ডার বার্কম্যান বলেন:
“বলশেভিকদের দৃষ্টিতে শ্রমিক শ্রেণির একনায়কত্ব আসলে শ্রমিক শ্রেণির ওপর একনায়কত্ব।”
৩. কেন্দ্রীকরণ বনাম স্বায়ত্তশাসন
মার্ক্সবাদ একটি কেন্দ্রীভূত, নেতৃত্বাধীন বিপ্লবের পক্ষে। বিপরীতে, অ্যানার্কিস্টরা জোর দেন বিকেন্দ্রীকরণ, সরাসরি গণতন্ত্র এবং স্ব-পরিচালনার ওপর।
এরিকো মালাতেস্তা লিখেছেন:
“রাষ্ট্র একটি নিরপেক্ষ কাঠামো নয়। এটি একটি আধিপত্যমূলক প্রতিষ্ঠান, এবং তা শ্রমিকদের হাতেও পড়লে শোষণের যন্ত্রই থাকবে।” — “Anarchy” (১৮৯১)
তিনি মনে করতেন, কেন্দ্রীভূত দল বা পার্টি দায়িত্বহীন ও স্বৈরাচারী হয়ে ওঠে, যা বিপ্লবকে গণমানুষ থেকে বিচ্ছিন্ন করে।
৪. ইতিহাসের গতিধারা না কি নৈতিক বিদ্রোহ?
মার্ক্সবাদ ইতিহাসকে দেখেছে বস্তুবাদী ও অর্থনৈতিক দ্বন্দ্বের মাধ্যমে। কিন্তু অ্যানার্কিস্টরা মানুষ ও নৈতিকতার ভূমিকা নিয়ে অধিক গুরুত্ব দেন।
গুস্তাভ ল্যান্ডাওয়ার লিখেছেন:
“রাষ্ট্র এমন কিছু নয় যা কেবল বিপ্লব দিয়ে ধ্বংস করা যায়। এটি এক ধরণের সম্পর্ক, এক ধরণের সামাজিক অবস্থা। আমরা নতুন সম্পর্ক সৃষ্টি করেই এটিকে ধ্বংস করবো।” — “Revolution and Other Writings” (১৯১১)
অন্যদিকে, ক্রপটকিন বলেন:
“বিপ্লব কেবল রুটির জন্য নয়, জীবনের স্বাধীনতা ও বিকাশের জন্যও।” — “The Conquest of Bread” (১৮৯২)
৫. অনুশীলন বনাম তত্ত্ব
অ্যানার্কিস্টদের মতে, মার্ক্সবাদ অতিমাত্রায় তাত্ত্বিক ও ভবিষ্যৎমুখী। বিপরীতে, অ্যানার্কিস্টরা চর্চা, সরাসরি অংশগ্রহণ এবং স্ব-প্রতিষ্ঠানকেই গুরুত্ব দেন।
স্পেনের বিপ্লব (১৯৩৬) ছিল অ্যানার্কিস্ট ভাবনার বাস্তব রূপ। যেখানে কারখানা, খামার ও পাড়া-মহল্লা পরিচালিত হয়েছে শ্রমিকদের স্ব-পরিচালনায়।
নোয়াম চমস্কি লিখেছেন:
“অ্যানার্কিস্ট ইতিহাসের সবচেয়ে অনুপ্রেরণামূলক অধ্যায় ছিল স্পেনের বিপ্লব। এটি ছিল একটি দলনির্ভর নয়, গণভিত্তিক সমাজ গঠনের প্রকৃত প্রচেষ্টা।” — “Notes on Anarchism” (১৯৭০)
৬. মার্ক্সবাদী রাষ্ট্রের ঐতিহাসিক পরিণতি
সোভিয়েত ইউনিয়ন, চীন, কিউবা বা উত্তর কোরিয়া—সবগুলো মার্ক্সবাদী রাষ্ট্রই এক পর্যায়ে হয়ে উঠেছে নতুন ধরনের দমনমূলক ব্যবস্থায়। একে অ্যানার্কিস্টরা বলেছেন “রাষ্ট্র-ক্যাপিটালিজম”।
মারে বুকচিন বলেন:
“মার্ক্সবাদের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি হলো—যা কিছু ধ্বংস করতে চেয়েছিল, শেষ পর্যন্ত তা-ই হয়ে উঠেছে।” — “Post-Scarcity Anarchism” (১৯৭১)
উপসংহার: বিপ্লবের দুই ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি
অ্যানার্কিস্ট সমালোচনার মূল ভিত্তি হলো—বিপ্লবের লক্ষ্য ও পদ্ধতি একে অপরের থেকে বিচ্ছিন্ন নয়। যে বিপ্লব রাষ্ট্রকে ব্যবহার করে, সে কখনোই প্রকৃত স্বাধীনতা অর্জন করতে পারে না।
বাকুনিন বলেন:
“স্বাধীনতা ছাড়া সমাজতন্ত্র মানে হলো দাসত্ব ও নিষ্ঠুরতা; আর সমাজতন্ত্র ছাড়া স্বাধীনতা মানে হলো বৈষম্য ও অবিচার।”
তাই আজকের দিনে আমাদের দরকার এমন একটি বিপ্লবী দৃষ্টিভঙ্গি, যা অ্যানার্কিজমের স্বাধীনতা এবং মার্ক্সবাদের সাম্য—এই দুইকে মিলিয়ে এক নতুন সমাজ নির্মাণের পথ দেখাতে পারে।
Comments
Leave a comment Cancel reply
More posts
Source: BASFD Bangladesh
