স্প্যানিশ বিপ্লবের ট্র্যাজেডি ও তার শিক্ষা: নৈরাজ্যবাদী দৃষ্টিকোণ থেকে
১. পটভূমি: স্প্যানিশ বিপ্লব কী ছিল?
১৯৩৬ থেকে ১৯৩৯ সালের মধ্যে স্পেনে গৃহযুদ্ধের সময়, সামরিক ফ্যাসিস্ট বিদ্রোহের বিরুদ্ধে জনগণ বিদ্রোহ করেছিল। এই সময়ে বিশেষ করে কাতালোনিয়া, আরাগন ও আন্দালুসিয়ার কিছু অংশে শ্রমিক ও কৃষকেরা নৈরাজ্যবাদী সংগঠন CNT ও FAI-এর নেতৃত্বে একটি সমাজ বিপ্লব শুরু করে।
তারা কারখানা, জমি, হাসপাতাল, স্কুল ইত্যাদি বস ও পুঁজিপতিরা ছাড়াই গণতান্ত্রিকভাবে পরিচালনা করতে শুরু করে। এটি আধুনিক ইতিহাসে নৈরাজ্যবাদী সমাজ নির্মাণের অন্যতম সাহসী প্রয়াস ছিল।
২. বিপ্লবের সাফল্য
নৈরাজ্যবাদী দৃষ্টিতে, এই বিপ্লব দেখিয়েছে কীভাবে অনুপ্রেরণামূলক, বিকেন্দ্রীকৃত ও অনুভবনশীল সমাজ গঠন সম্ভব:
- শ্রমিক নিয়ন্ত্রণ: হাজার হাজার কারখানা ও পরিবহনব্যবস্থা সরাসরি শ্রমিক কমিটির মাধ্যমে চলছিল।
- গ্রামীণ সমবায়ীকরণ: বহু গ্রামে জমি একত্রিত করে যৌথভাবে চাষাবাদ হতো; অনেক জায়গায় মুদ্রাও বিলুপ্ত করা হয়।
- মুক্ত শিক্ষা ও চিকিৎসা: নিজেরা পরিচালিত স্কুল ও হাসপাতাল গড়ে উঠে পারস্পরিক সহায়তার ভিত্তিতে।
- জনগণের মিলিশিয়া: কোনো কেন্দ্রীভূত সেনাবাহিনী নয়, বরং স্বেচ্ছাসেবক গেরিলা বাহিনী যুদ্ধ করছিল সম্পূর্ণ গণতান্ত্রিকভাবে।
এই অভিজ্ঞতা প্রমাণ করে—নৈরাজ্যবাদ কেবল তত্ত্ব নয়, প্রয়োগযোগ্য বাস্তবতা।
৩. ট্র্যাজেডি: কীভাবে বিপ্লব ভেঙে পড়ল?
ক. কমিউনিস্ট পার্টির ভূমিকা (PCE/PSUC):
- সোভিয়েতপন্থী কমিউনিস্টরা রাষ্ট্রক্ষমতা দখলে আগ্রহী ছিল।
- তারা নৈরাজ্যবাদীদের বিরুদ্ধে চক্রান্ত করে, সমবায় ভেঙে দেয় এবং জনগণের নিয়ন্ত্রণকে দমন করে।
খ. প্রজাতান্ত্রিক সরকারের ভূমিকা:
- সরকার সামাজিক বিপ্লব নয়, রাষ্ট্র রক্ষায় আগ্রহী ছিল।
- কিছু নৈরাজ্যবাদী নেতৃত্ব (CNT-FAI) মন্ত্রিসভায় যোগ দেন, যা আদর্শের আপস এবং বিপ্লবী শক্তির দুর্বলতা সৃষ্টি করে।
গ. মিলিশিয়া বাহিনীর সামরিককরণ:
- স্বেচ্ছা গেরিলা বাহিনীকে রূপান্তর করা হয় কেন্দ্রীয় সেনাবাহিনীতে, যা বিপ্লবের আত্মা ধ্বংস করে।
ঘ. ফ্যাসিস্ট হামলা:
- ফ্রাঙ্কোর সেনাবাহিনী জার্মানি ও ইতালির সহায়তায় জনগণের ওপর নৃশংস হামলা চালায় এবং একে একে অঞ্চলগুলো পুনর্দখল করে।
৪. নৈরাজ্যবাদীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা
i. বিপ্লব ও যুদ্ধ একত্রেই এগোতে হয়
- “যুদ্ধ আগে, বিপ্লব পরে” – এই ভুল কৌশল বিপর্যয় ডেকে আনে।
- বিপ্লব বিলম্ব করলে তা প্রতিক্রান্তি দ্বারা গ্রাস হয়।
ii. রাষ্ট্রকে কখনো বিশ্বাস করা যায় না
- “প্রগতিশীল” রাষ্ট্রও শেষ পর্যন্ত বিপ্লবী শক্তিকে দমন করে।
iii. একনায়কতান্ত্রিক সমাজতন্ত্রও বিপদজনক
- সোভিয়েতপন্থী বামরা দেখিয়েছে—তাদের রাষ্ট্রবাদও শ্রমিকশত্রু হতে পারে।
iv. সংগঠন মানেই শাসন নয়
- CNT-FAI প্রমাণ করেছে—শ্রমিক শ্রেণিভিত্তিক স্ব-সংগঠিত আন্দোলনই নৈরাজ্যবাদী বিপ্লবের প্রাণ।
v. আত্মরক্ষা অপরিহার্য
- বিপ্লবকে রক্ষা করতে চাইলে প্রতিরোধ সংগঠিত করাই দায়িত্ব।
৫. আত্মা রয়ে গেছে জীবিত
স্প্যানিশ বিপ্লব সামরিকভাবে পরাজিত হলেও তার আদর্শ আজও রোজাভা, জাপাতিস্তাস এবং বিশ্বজুড়ে নৈরাজ্যবাদী আন্দোলনে জীবিত।
এর ভুলগুলো আমাদের শেখায়—আপস নয়, আত্মরক্ষার মধ্যে দিয়েই বিপ্লব রক্ষা করতে হবে।
৬. উপসংহার
স্প্যানিশ বিপ্লব ছিল এক মহান স্বপ্নের উত্থান ও পতন। এটি আমাদের শিখিয়েছে—
- স্বশাসিত সমাজ বাস্তবসম্মত
- রাষ্ট্র, যেকোনো রূপেই হোক, বিপ্লবের শত্রু
- একমাত্র জনগণের সংগঠিত শক্তিই মুক্তির পথ
Comments
Leave a comment Cancel reply
More posts
Source: BASFD Bangladesh
