বাংলাদেশ : চা শ্রমিকদের জীবন চিত্র
by Bangladesh AnarchoSyndicalist Federation – BASF
চা শ্রমিকদের জীবনচিত্র ও এনার্কিস্ট আদর্শ : নিপীড়নের গ্লানি ও মুক্তির আকাঙ্ক্ষা
ভূমিকা
স্মার্ট বাংলাদেশ গঠনের উচ্চাশায় আমরা যখন প্রযুক্তিনির্ভর উন্নয়নের কথা বলি, তখন আমাদের চোখ এড়িয়ে যায় সেই সমাজপ্রান্তিক মানুষের দুর্দশা, যাদের ঘামে গড়ে ওঠে অর্থনীতির একেকটি স্তম্ভ। এমন এক উপেক্ষিত গোষ্ঠী হলো বাংলাদেশের চা শ্রমিক জনগোষ্ঠী। তারা মূলত উপনিবেশিক কালে ভারতবর্ষের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে এনে পাহাড়ি এলাকায় স্থায়ী করে রাখা এক জাতিগোষ্ঠী, যারা যুগের পর যুগ চায়ের পাতায় রক্ত ও ঘাম ঢেলে দিলেও নিজেদের মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত। এই বাস্তবতা বিশ্লেষণে আজ প্রয়োজন এনার্কিস্ট দৃষ্টিকোণ থেকে এক বিকল্প সমাজ-চিন্তার আলোকপাত।
জীবনের চিত্র : লাক্কাতুরা ও অনুরূপ বাগানের প্রতিচ্ছবি
লাক্কাতুরা চা বাগানের সকাল মনির ও কুয়াশ মনিদের গল্প শুধু একটি পরিবারের নয়, বরং হাজারো চা শ্রমিক পরিবারের আর্তনাদের প্রতিধ্বনি। অপ্রতুল স্যানিটেশন, বিশুদ্ধ পানির সংকট, স্বাস্থ্যসেবার নামে প্রহসন, মজুরীর নামে অপমান, শিক্ষা থেকে বঞ্চনা—সবই এই জনগোষ্ঠীর রুটিন রিয়ালিটি।
চা শ্রমিক ইউনিয়নের নেতা রাজু গোয়ালার কথায় উঠে এসেছে এই বাস্তবতা:
“একটা মানুষের বেঁচে থাকার জন্য যে বিশুদ্ধ পানির প্রয়োজন, সেটিও যদি এ যুগে এসে সরবরাহ করা না যায়, তাহলে বুঝতে হবে আমাদের কত শত সংকট রয়েছে।”
এনার্কিস্ট ভাবনা ও শোষণ-মুক্ত সমাজ
এনার্কিজম (anarchism) এক আদর্শ যা রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ব, পুঁজিবাদী শোষণ ও কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণের বিরোধিতা করে। পিয়র ক্রপটকিন, মিখাইল বকুনিন, এমা গোল্ডম্যানের মতো চিন্তাবিদেরা বলেন—
“The State is the coldest of all cold monsters.” – Friedrich Nietzsche (an inspiration to anarchists)
বাংলাদেশের চা শ্রমিক সমাজকে দেখলে রাষ্ট্র বা মালিকানাধীন কর্তৃত্বব্যবস্থার ঠাণ্ডা দানবীয় মুখটি স্পষ্ট হয়। ১৭০ টাকার মজুরি, ৩ কেজি আটার রেশন, স্বাস্থ্যহীন বাগান হাসপাতাল—এই সমস্ত শর্তে মানুষ নয়, দাসত্ব লালিত হচ্ছে।
শ্রম-শোষণের বাস্তবতা : পুঁজিবাদ ও রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতা
চা উৎপাদনে বাংলাদেশের রেকর্ড বৃদ্ধির মাঝেও শ্রমিকরা মানবেতর জীবন যাপন করছে। এনার্কিস্ট দৃষ্টিভঙ্গিতে, পুঁজিবাদ কেবল পণ্যের দাম বাড়ায় না, মানুষকেও পণ্যে রূপান্তর করে। চা শ্রমিকদের ক্ষেত্রে এটি নিখুঁতভাবে সত্য।
এমা গোল্ডম্যান বলেন—
“The most violent element in society is ignorance.”
এই অজ্ঞতার জন্ম দেয় সেই রাষ্ট্র ও সমাজ, যারা চা শ্রমিকদের বাস্তবতা জানে কিন্তু উপেক্ষা করে। ৯৮টি জাতিগোষ্ঠী থাকলেও সরকারি প্রজ্ঞাপনে অন্তর্ভুক্ত মাত্র কয়েকটি, বাকিরা ‘আইনি অস্তিত্বহীনতা’তে ভোগে।
নারীর দ্বিগুণ শোষণ
চা বাগানের নারী শ্রমিকেরা কেবল অর্থনৈতিক নয়, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক দ্বৈত নিপীড়নের শিকার। এনার্কিস্ট ও নারীবাদী চিন্তক এমা গোল্ডম্যান বলেন—
“True emancipation begins neither at the polls nor in the courts. It begins in woman’s soul.”
চা শ্রমিক নারীদের মুক্তি কেবল আইনি কোটায় নয়, বরং নিজস্ব সম্মান, শিক্ষা, স্বাস্থ্যের অধিকার নিশ্চিত করার মাধ্যমেই অর্জনযোগ্য।
বিকল্প ভাবনা : সমবায়ী স্ব-পরিচালিত সমাজের প্রয়োজন
এনার্কিস্ট সমাজব্যবস্থা কেন্দ্রমুক্ত, দমনহীন, ন্যায্যতা-ভিত্তিক। এর মূলে রয়েছে স্ব-শাসিত কমিউন, অংশগ্রহণমূলক সিদ্ধান্ত এবং অর্থনৈতিক গণ-নিয়ন্ত্রণ। চা শ্রমিকদের নিয়ন্ত্রণ মালিকের হাতে না থেকে সমবায়ী মালিকানা ও উৎপাদন ব্যবস্থা গঠনের মাধ্যমে তাদের অধিকার নিশ্চিত করা সম্ভব।
পিয়র ক্রপটকিন এর ভাষায়—
“Work must be associated, voluntary and free from capitalist control.”
চা শ্রমিকদের ক্ষেত্রে এটি মানে হবে:
- মালিকানা তাদের হাতে
- উৎপাদনের লাভ সমভাবে বণ্টন
- স্বাস্থ্য, শিক্ষা, পানি, বাসস্থান অধিকার হিসেবে নিশ্চিত
শোষণ নয়, সংহতি
চা শ্রমিকদের জীবনচিত্র রাষ্ট্র ও মূলধারার সমাজের এক লজ্জাজনক মুখোশ উন্মোচন করে। তারা আমাদেরই নাগরিক, অথচ রাষ্ট্র তাদের সেবকের বদলে শোষকের ভূমিকা পালন করে।
এনার্কিস্টদের মতে, সমাজ গঠনের মৌলিক ভিত্তি হওয়া উচিত স্বাধীনতা ও সংহতি। রাষ্ট্র যখন এসব দিতে ব্যর্থ, তখন প্রয়োজন grassroots সংগঠন, সরাসরি গণ-অংশগ্রহণ ও বিকেন্দ্রীকৃত বিকল্প প্রশাসন।
উপসংহার
চা শ্রমিকদের মুক্তি এক করুণা নয়, এটি তাদের ন্যায্য অধিকার। এই অধিকার ফিরিয়ে আনতে হলে দরকার রাষ্ট্র ও পুঁজির যান্ত্রিক শৃঙ্খল ছিন্ন করে এক সমতা-ভিত্তিক বিকল্প সমাজব্যবস্থার চিন্তা। আর সেই পথেই এনার্কিস্ট দর্শন এক বাস্তব প্রতিরোধের ভাষা।
তাই আজ লাক্কাতুরা থেকে মৌলভীবাজার, শ্রীমঙ্গল থেকে পঞ্চগড়—সর্বত্র একটাই দাবি উঠুক: “ভুলে যেও না, আমরা মানুষ। আমাদের অধিকার ফেরাও।”

Comments
Leave a comment Cancel reply
More posts
Source: BASFD Bangladesh
