সাম্যবাদী আন্দোলনের প্রথম আন্তর্জাতিকে মাইকেল বাকুনিন ও কার্ল মার্ক্স!
এডভোকেট এ কে এম শিহাব
সাম্যবাদী আন্দোলনের প্রথম আন্তর্জাতিক এবং মিকাইল বাকুনিন ও তাঁর সাথীদের ভূমিকা ও মূল্যায়ন
ভূমিকা
উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময় ছিল ইউরোপের শ্রমজীবী মানুষের জন্য প্রবল উত্তাল ও রক্তাক্ত সংগ্রামের যুগ। পুঁজিবাদী উৎপাদন ব্যবস্থার নিষ্ঠুর শোষণ ও সমাজতান্ত্রিক আদর্শের উন্মেষের এক সন্ধিক্ষণে জন্ম নেয় প্রথম আন্তর্জাতিক বা International Workingmen’s Association (IWA)। এই সংগঠনের মধ্য দিয়ে শ্রমিক শ্রেণি প্রথমবারের মতো আন্তর্জাতিক ঐক্যের স্বপ্ন দেখতে শুরু করে। এ ঐতিহাসিক আন্দোলনে মিকাইল বাকুনিন ও তাঁর সাথীরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। বিশেষ করে রাষ্ট্র ও কেন্দ্রীয় কর্তৃত্বের বিরোধিতা করে শ্রমিকদের সরাসরি ক্ষমতায়নের আদর্শে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেন।
প্রথম আন্তর্জাতিক: পটভূমি ও লক্ষ্য
১৮৬৪ সালের ২৮শে সেপ্টেম্বর লন্ডনের সেন্ট মার্টিন হলে বিভিন্ন দেশের শ্রমিক প্রতিনিধিরা একত্রিত হয়ে “International Workingmen’s Association” প্রতিষ্ঠা করেন। এর উদ্দেশ্য ছিল আন্তর্জাতিক পর্যায়ে শ্রমিকদের ঐক্য গঠন এবং পুঁজিবাদী শোষণের বিরুদ্ধে সম্মিলিত প্রতিরোধ সৃষ্টি করা। এখানে বিভিন্ন মতাদর্শের মানুষ সমবেত হয়েছিলেন — উদারপন্থী সমাজতন্ত্রী, মার্কসবাদী বিপ্লবী, প্যরোডনবাদী রিফর্মিস্ট, ইংরেজ ট্রেড ইউনিয়নিস্ট এবং রুশ বিপ্লবী নৈরাজ্যবাদী ইত্যাদি।
প্রথম আন্তর্জাতিক ছিল এক বৃহৎ পরীক্ষাগার, যেখানে সমাজ পরিবর্তনের পথ নিয়ে তীব্র বিতর্ক চলেছিল। এই বিতর্কের কেন্দ্রে ছিলেন দুই বিশাল ব্যক্তিত্ব: কার্ল মার্কস ও মিকাইল বাকুনিন।
মিকাইল বাকুনিন: জীবন ও চিন্তাধারা
মিকাইল বাকুনিন (১৮১৪-১৮৭৬) ছিলেন একজন রুশ অভিজাত পরিবারে জন্ম নেয়া বিপ্লবী, যিনি যৌবনকালে জারশাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলনে জড়িয়ে পড়েন। পরে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে ঘুরে ঘুরে তিনি এক নতুন ধরনের বিপ্লবী দর্শন নির্মাণ করেন, যা ছিল:
- রাষ্ট্র ও সকল কেন্দ্রীকৃত কর্তৃত্বের সম্পূর্ণ বিলুপ্তির আহ্বান;
- শ্রমিক ও কৃষকদের সরাসরি সংগ্রামের ওপর জোর;
- সকল উৎপাদন উপকরণের সামাজিক মালিকানা ও স্থানীয় সম্প্রদায়ের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ;
- ব্যক্তির পূর্ণ স্বাধীনতা এবং স্বশাসিত কমিউনাল জীবনের স্বপ্ন।
বাকুনিন বিশ্বাস করতেন:
“স্বাধীনতার মধ্যে দিয়ে সাম্য আসতে পারে; সাম্যের নামে যদি স্বাধীনতা নষ্ট করা হয়, তবে সেটা আর সাম্য নয় বরং দাসত্ব।”
এভাবেই বাকুনিন মার্কসের রাষ্ট্রনির্ভর সমাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে “নৈরাজ্যবাদী সমাজতন্ত্র” এর ধারণা উপস্থাপন করেন।
বাকুনিনের আন্তর্জাতিকের মধ্যে কাজ
১৮৬৮ সালে বাকুনিন আনুষ্ঠানিকভাবে প্রথম আন্তর্জাতিকের সঙ্গে যুক্ত হন এবং দ্রুত সংগঠনের একটি শক্তিশালী বিপ্লবী নৈরাজ্যবাদী ধারার নেতৃত্ব দিতে শুরু করেন। তিনি শ্রমিকদের মধ্যে একটি বিকেন্দ্রীকৃত সংগঠন গঠনের পক্ষে মত দেন, যেখানে স্থানীয় কমিউন এবং ইউনিয়নসমূহ সরাসরি নিজেদের ভাগ্য নির্ধারণ করবে। তাঁর প্রতিষ্ঠিত “Alliance for Socialist Democracy” সংগঠনটি ছিল এই ধারণার বাস্তব রূপ।
তাঁর তত্ত্ব অনুযায়ী:
- কোনও রকম সংসদীয় রাজনীতি নয়,
- শ্রমিকদের সরাসরি সংগ্রাম,
- উৎপাদন ও সম্পদের উপর শ্রমিকের সরাসরি অধিকার প্রতিষ্ঠা।
বাকুনিনের ভাষায়:
“স্বাধীনতা ও কর্তৃত্ব পরস্পরবিরোধী। একটির অস্তিত্ব মানে অন্যটির বিলুপ্তি।”
বাকুনিন বনাম মার্কস: মতাদর্শিক সংঘাত
কার্ল মার্কস প্রথম আন্তর্জাতিকের একটি কেন্দ্রীভূত রাজনৈতিক সংগঠনে রূপান্তর ঘটাতে চেয়েছিলেন, যেখানে শ্রমিক শ্রেণির একনায়কত্বের মাধ্যমে বিপ্লব সংগঠিত হবে। মার্কসের মতে, একটি রূপান্তরী শ্রমিক রাষ্ট্র ছাড়া পুঁজিবাদী শোষণের অবসান সম্ভব নয়।
বাকুনিন এই ধারণাকে তীব্রভাবে প্রত্যাখ্যান করেন। তাঁর যুক্তি ছিল:
- রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা যে-ই ধারণ করুক না কেন, তা শেষ পর্যন্ত শোষণের নতুন রূপে পরিণত হবে।
- বিপ্লবের মাধ্যমে যদি একটি নতুন সরকার গড়ে ওঠে, তবে তা নতুন শাসক শ্রেণিতে পরিণত হবে এবং শ্রমিক আবারও পরাধীন হয়ে পড়বে।
এ সম্পর্কে বাকুনিন মন্তব্য করেন:
“রাষ্ট্রীয় সমাজতন্ত্র শ্রমিকদের মুক্তি নয়, বরং তাদের দাসত্বের আরেক রূপ।”
এই মতপার্থক্য ক্রমে সংঘর্ষে রূপ নেয় এবং ১৮৭২ সালে হেগ কংগ্রেসে মার্কস ও তাঁর অনুসারীরা বাকুনিন ও গিলোমকে আন্তর্জাতিক থেকে বহিষ্কার করেন।
সেন্ট ইমিয়ার কনফারেন্স ও নৈরাজ্যবাদী ধারার প্রতিষ্ঠা
বাকুনিন ও তাঁর অনুসারীরা ১৮৭২ সালের সেপ্টেম্বরে সুইজারল্যান্ডের সেন্ট ইমিয়ার শহরে নতুন এক সম্মেলন আহ্বান করেন, যা পরিচিত হয় সেন্ট ইমিয়ার কনফারেন্স নামে। এখানে তারা ঘোষণা দেন:
- শ্রমিক শ্রেণির মুক্তি তাদের নিজেদের হাতেই ঘটাতে হবে; কোনো রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিত্বের মাধ্যমে নয়।
- সকল কেন্দ্রীকরণ ও কর্তৃত্ববাদী সংস্থা প্রত্যাখ্যান করতে হবে।
- স্থানীয় ইউনিয়ন ও কমিউনগুলির সরাসরি সংহতির মাধ্যমে নতুন সমাজ নির্মাণ করতে হবে।
এই কনফারেন্স থেকেই আধুনিক নৈরাজ্যবাদী আন্দোলনের ভিত্তি দৃঢ় হয়।
বাকুনিনের ভবিষ্যদ্বাণী এবং বাস্তবতা
মিকাইল বাকুনিন ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন:
“কার্ল মার্কসের রাষ্ট্রীয় সমাজতন্ত্র শেষ পর্যন্ত এক ধরণের নতুন একনায়কত্বে পরিণত হবে, যেখানে নতুন প্রজাতন্ত্র হবে নতুন ধরণের শাসক শ্রেণির কারাগার।”
পরে ইতিহাস দেখিয়েছে, সোভিয়েত ইউনিয়নের মতো রাষ্ট্রগুলোতে শ্রমিক শ্রেণির নামে এক পার্টি-রাষ্ট্রের নির্মাণ হয়েছিল, যা বাকুনিনের সতর্কবাণীকেই সত্য করে তোলে।
মূল্যায়ন
মিকাইল বাকুনিনের ও তাঁর সাথীদের অবদান ছিল অসামান্য:
- তারা আন্তর্জাতিক শ্রমিক আন্দোলনের মধ্যে রাষ্ট্র-বিরোধী সমাজতান্ত্রিক আদর্শের বীজ বপন করেন।
- শ্রমিক শ্রেণির নিজস্ব শক্তির ওপর আস্থা রাখার ধারণা বিস্তৃত করেন।
- পরবর্তী আনক্রো-সিন্ডিকালিজম, নৈরাজ্যবাদী কমিউনিজম, এবং বিকেন্দ্রীকৃত সমাজতান্ত্রিক ভাবনার পথপ্রদর্শক হয়ে ওঠেন।
যদিও প্রথম আন্তর্জাতিক মার্কস ও বাকুনিনের দ্বন্দ্বের ফলে বিভক্ত হয়, তবে বাকুনিনের চিন্তাধারা শ্রমিক মুক্তি সংগ্রামের ইতিহাসে এক অনন্য বৈপ্লবিক চেতনা হিসেবে চিরকাল প্রাসঙ্গিক হয়ে আছে।
উপসংহার
মিকাইল বাকুনিন শুধুমাত্র একজন তাত্ত্বিক চিন্তাবিদ ছিলেন না, বরং ছিলেন বাস্তব সংগ্রামের সৈনিক, যিনি স্বাধীনতা, সাম্য ও ভ্রাতৃত্বের সত্যিকারের সমাজ গড়ার জন্য আজীবন সংগ্রাম করেছিলেন। প্রথম আন্তর্জাতিকের ইতিহাসে তাঁর ও তাঁর সাথীদের ভূমিকা ছিল ইতিহাসের গতিপথ পরিবর্তনের মতোই গুরুত্বপূর্ণ। আজকের দিনেও বাকুনিনের ডাক—”শ্রমিক শ্রেণির মুক্তি তাদের নিজেদের হাতেই”—বিশ্বের সকল শোষিত মানুষের সংগ্রামে অনুপ্রেরণার দীপ্ত আলো জ্বালিয়ে যাচ্ছে।
[প্রবন্ধ সমাপ্ত]

Comments
Leave a comment Cancel reply
More posts
Source: BASFD Bangladesh
